একটি দেশের রাষ্ট্রচরিত্র বোঝা যায় সে দেশের সংবিধান দিয়ে নয়, বোঝা যায় সেখানে দুর্বল মানুষ কতটা নিরাপদ। আজ বাংলাদেশে প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে—
“এই দেশে বিধর্মীরা সংসদে থাকতে পারবে না।”
এই বক্তব্য কোনো সাধারণ কথাবার্তা নয়। এটি সরাসরি একটি ঘোষণাপত্র:
বাংলাদেশকে আর নাগরিক রাষ্ট্র নয়, ধর্মীয় রাষ্ট্রে রূপান্তর করার ঘোষণা।
প্রশ্ন হলো—
যে দেশে সংখ্যালঘুদের সংসদে আসা নিষিদ্ধ, সেই দেশ কার?
মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে।
সে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষ।
তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছিল একটি রাষ্ট্র, যেখানে ধর্ম নয়—নাগরিকত্বই পরিচয়।
আজ যদি বলা হয়,
হিন্দু সংসদে যাবে না খ্রিষ্টান রাষ্ট্র চালাতে পারবে না বৌদ্ধ জনপ্রতিনিধি হতে পারবে না
তাহলে সেটা শুধু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নয়,
সেটা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
সংবিধান ছিঁড়ে ফেলার ঘোষণা
বাংলাদেশের সংবিধান বলে—
সকল নাগরিক সমান। ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না।
কিন্তু ধর্মীয় রাজনীতির মুখপাত্ররা আজ বলছে—
“এটা মুসলমানের দেশ, অন্যরা শাসন করবে কেন?”
এই বক্তব্য মানে দাঁড়ায়—
সংবিধান বাতিল নাগরিকত্ব বাতিল গণতন্ত্র বাতিল
এটা কোনো মতামত নয়,
এটা রাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতি।
ইতিহাস জানে এই পথের শেষ কোথায়
যখনই কোনো দেশে বলা হয়েছে—
“এই দেশ শুধু আমাদের ধর্মের”
সেখানেই শুরু হয়েছে—
সংখ্যালঘু নিধন নারী অধিকার ধ্বংস ভিন্নমত দমন ভয় ও রক্তের রাজনীতি
আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপ—সবই এই দর্শনের ফল।
বাংলাদেশ কি সেই তালিকায় নাম লেখাতে চায়?
রাষ্ট্রের নীরবতা = সম্মতি
একজন ব্যক্তি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংবিধান লঙ্ঘনের কথা বলে।
আর রাষ্ট্র বলে—
লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।”
এই নীরবতা কোনো প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়।
এই নীরবতা রাজনৈতিক বার্তা।
বার্তাটা হলো—
এই বক্তব্য সহনীয়
এই ঘৃণা বৈধ
এই রাজনীতি অনুমোদিত
এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
এই লড়াই শুধু সংখ্যালঘুদের নয়
অনেকে ভাবছে—এটা শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের সমস্যা।
এটা ভুল।
ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রথমে সংখ্যালঘুদের দমন করে,
তারপর নারীদের,
তারপর ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদের,
শেষে নিজের সন্তানদেরই খায়।
এটা ইতিহাসের নিয়ম।
দেশ কার?
যে দেশে সংখ্যালঘুদের সংসদে আসা নিষিদ্ধ—
সে দেশ কি জনগণের?
সে দেশ কি মুক্তিযুদ্ধের?
সে দেশ কি সংবিধানের?
না।
সে দেশ হয়—
একদল উগ্র মতাদর্শীর একদল ধর্ম ব্যবসায়ীর একদল ক্ষমতালোভীর
রাষ্ট্র আর থাকে না,
থাকে শুধু ভয়।
এখনই সিদ্ধান্তের সময়
বাংলাদেশ আজ দুই পথের সামনে দাঁড়িয়ে—
এক পথ:
সংবিধান গণতন্ত্র সমান অধিকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
আরেক পথ:
ধর্মীয় একনায়কত্ব মধ্যযুগীয় শাসন সংখ্যালঘু নিধন ভয় ও বিভাজন
মাঝামাঝি কোনো রাস্তা নেই।
উপসংহার বলতে চাই ,,,,,
যে দেশে সংখ্যালঘুদের সংসদে আসা নিষিদ্ধ—
সে দেশ আর বাংলাদেশ থাকে না।
সে দেশ হয়ে যায় একটি গোষ্ঠীর দখলকৃত ভূখণ্ড।
বাংলাদেশ কোনো গোষ্ঠীর নয়।
বাংলাদেশ সবার।
আর এই সত্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু সংখ্যালঘুদের নয়—
এই দায়িত্ব প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের।
কারণ আজ যদি সংখ্যালঘুর অধিকার কাড়া যায়,
আগামীকাল কাড়া হবে আপনারটাও।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান