বাংলাদেশ কি সত্যিই সেই পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল সাধারণ মানুষ?

একসময় বলা হয়েছিল—দেশে গণতন্ত্র ফিরবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতি কমবে, মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু আজ প্রশ্ন হচ্ছে—সেই প্রত্যাশার কতটা বাস্তবে এসেছে?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেছে। তাদের অন্যতম বড় দায়িত্ব ছিল সংস্কারের পরিবেশ তৈরি করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। 

কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেই কি মানুষের জীবন বদলে যায়?

আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।

রাজনীতির মঞ্চে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কি কমেছে? দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং মানুষের নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে জনগণ বাস্তবে কী পাচ্ছে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে সংস্কারের কথা এতদিন বলা হয়েছে, সেগুলো কি সত্যিই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করছে, নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে শুধু নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে?

সাম্প্রতিক সময়ে Human Rights Watch বাংলাদেশের কয়েকটি নতুন আইন নিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। 

অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে Carnegie-এর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর দেশ আবার পরিচিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। 

তাহলে প্রশ্নটা শুধু ড. ইউনূস বা তারেক রহমানকে নিয়ে নয়।

প্রশ্নটা হলো—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি দলকে দায়ী করলেই কি বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হবে?

নাকি আমাদের দেখতে হবে—

• দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে?
• সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা বদলেছে?
• তরুণদের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কী?
• দুর্নীতি কমেছে, নাকি শুধু তার ধরন বদলেছে?
• প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছে?
• মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা নিরাপদ?
• রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি কি শেষ হয়েছে?
• বিচারব্যবস্থা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?
• রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে?

একটি দেশ শুধু প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলায় না।

একটি দেশ বদলায় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জবাবদিহি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

তাই আজ প্রয়োজন অন্ধ সমর্থন নয়, অন্ধ বিরোধিতাও নয়।

প্রয়োজন প্রশ্ন করা।

প্রয়োজন সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা।

প্রয়োজন ক্ষমতাসীনদের কাছে জবাব চাওয়া—তারা জনগণের জন্য কী করেছেন এবং কী করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি, দল বা পরিবারের সম্পত্তি নয়।

বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ।

ইউনূস সরকার হোক, তারেক রহমানের সরকার হোক কিংবা ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার—ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণ স্থায়ী।

তাই আজকের প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“কে ক্ষমতায়?”—এর চেয়েও বড় প্রশ্ন, “ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বাংলাদেশ কি সত্যিই জনগণের জন্য এগিয়ে যাচ্ছে?”

এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস দেবে না শুধু—উত্তর দেবে আমাদের অর্থনীতি, আমাদের প্রতিষ্ঠান, আমাদের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।

বাংলাদেশ কারও বাপের দেশ নয়, কারও মায়ের দেশও নয়—বাংলাদেশ ১৮ কোটি বাংলাদেশির দেশ।

ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, জনগণের জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারেরই। অথচ রাজনৈতিক সংঘাত, হত্যা, হামলা, অস্থিরতা ও মানুষের নিরাপত্তাহীনতার খবর যখন বারবার সামনে আসে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি সত্যিই সেই বাংলাদেশের দিকে এগোচ্ছি, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল?

একটা প্রশ্ন আরও জোরালোভাবে করা দরকার—

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা ও নানা ধরনের মানবাধিকার অভিযোগ ছিল। কিন্তু আজ যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে মানুষের মনে হয়, তাহলে তার কারণ কী?

কেন এত মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে?

কেন সাধারণ মানুষ বারবার জানতে চাইছে—রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কোথায়?

আর যদি জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাহলে সরকারের কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন আসবে না কেন?

সরকার কি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়?

ক্ষমতা কি শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য?

নাকি ক্ষমতার সঙ্গে জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার ও জবাবদিহির দায়িত্বও আসে?

আমি কোনো দলকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে চাই না। আওয়ামী লীগ হোক, বিএনপি হোক কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল—রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

বাংলাদেশ কারও বাপের দেশ নয়।
বাংলাদেশ কারও মায়ের দেশ নয়।
বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ।

এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন, ভোট, মতামত ও নিরাপত্তার মূল্য আছে।

তাই প্রশ্ন করাটা অপরাধ হওয়া উচিত নয়।

প্রশ্ন করতে হবে—

সরকার কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে?আইনশৃঙ্খলা কি যথেষ্ট কার্যকর?মানুষ কি নিরাপদ?রাজনৈতিক সহিংসতা কি কমছে?জবাবদিহি কি নিশ্চিত হচ্ছে?আর সরকার যদি সত্যিই ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় কে নেবে?

এমনকি প্রয়োজন হলে জনগণের কাছে সরকারের জবাব দেওয়া উচিত—কী কারণে পরিস্থিতি এমন হলো এবং পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সরকার কী করছে।

আর যদি কোনো সরকার জনগণের আস্থা হারায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ ক্রমেই গুরুতর হয়, তাহলে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে জবাবদিহি, সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজন হলে পদত্যাগের প্রশ্নও আলোচনার বাইরে থাকতে পারে না।

কারণ প্রধানমন্ত্রী বা কোনো রাজনৈতিক দল চিরস্থায়ী নয়।

চিরস্থায়ী বাংলাদেশ।চিরস্থায়ী জনগণ।ক্ষমতা সাময়িক।

আজ আওয়ামী লীগ নেই, কাল বিএনপি থাকবে না—পরশু হয়তো অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসবে।

কিন্তু বাংলাদেশ থাকবে।

তাই কোনো দল নয়, কোনো ব্যক্তি নয়—

সবার আগে বাংলাদেশ।
সবার আগে ১৮ কোটি মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ।

Posted in

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান